মোরশেদ আলম, বিশেষ প্রতিনিধি
প্রতি বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর যে পরিসংখ্যানটি আমাদের সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়, তা হলো পাসের হারের গোলকধাঁধায় লুকিয়ে থাকা হতাশার চিত্র। সর্বশেষ এইচএসসি পরীক্ষায় কেবল ইংরেজি বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন শিক্ষার্থী। এই বিশাল সংখ্যাটি নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয় বরং এটি আমাদের গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা ও ত্রুটিপূর্ণ মূল্যায়ন পদ্ধতির এক গভীর সংকট এবং নীরব ব্যর্থতার দলিল। প্রশ্ন জাগে, এ দেশের একজন শিক্ষার্থী যখন দ্বাদশ শ্রেণী পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার দোরগোড়ায় এসে কড়া নাড়ে, তখনো কেন তাকে ভিনদেশি এই ভাষার ব্যাকরণিক জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়?
এর মূল উত্তরটি লুকিয়ে আছে আমাদের দীর্ঘদিনের শেকড় গেড়ে বসা ‘মুখস্থ বিদ্যা’র সংস্কৃতির মধ্যে।
প্রাথমিক স্তর থেকেই আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে—ইংরেজি মানেই গাইডবইয়ের পাতা মুখস্থ করা, সিলেবাসের নির্দিষ্ট কিছু প্যারাগ্রাফ ও কম্পোজিশন মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উগড়ে দেওয়া। শিক্ষক ও অভিভাবকেরাও অনেক সময় সহজ উপায়ের সন্ধানে এই মুখস্থর পথকেই প্রশ্রয় দেন। কিন্তু সমস্যা বাধে তখন, যখন উচ্চমাধ্যমিক স্তরের প্রশ্নপত্রে সামান্য নতুনত্ব আনা হয় বা নতুন কোনো প্রেক্ষাপট থেকে বৈচিত্র্যময় প্রশ্ন করা হয়। মুখস্থ করা বিদ্যার ঘর তখন তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। পরীক্ষার্থীরা জানা উত্তরও নিজের মতো করে গুছিয়ে লিখতে পারেনা। ফলস্বরূপ, খাতার পাতায় লাল কালির দাগ আর শিক্ষার্থীদের চোখের জল।
আমাদের উপলব্ধি করার সময় এসেছে যে—ইংরেজি কোনো মুখস্থ করার বিষয় নয়, এটি একটি জীবন্ত ভাষা। ভাষা মানে ভাবের সফল আদান-প্রদান। একজন মানুষ যখন মাতৃভাষার মতো কোনো ভাষাকে নিজের অনুভূতির সাথে মেলাতে শেখে, তখন তার আর কোনো সাজেশনের প্রয়োজন হয় না। পরীক্ষার হলে প্রশ্ন কমন পড়ল কি না, সেই আতঙ্কে তার বুক কাঁপে না। এই মুক্তির একমাত্র এবং মোক্ষম চাবিকাঠি হলো ফ্রিহ্যান্ড রাইটিং।
ফ্রিহ্যান্ড রাইটিং কোনো জাদুকরি কৌশল নয়, এটি নিয়মিত চর্চার ফসল। লেখার শুরুতেই ব্যাকরণের ভুল নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। ভুল করতে করতেই মানুষ শেখে।জগতে ভুল করেনি এমন কেউ নেই। নির্ভুল লেখার চাপ তরুণদের কলম থামিয়ে দেয়, যা দূর করতে হবে।কেবল পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে আটকে না থেকে ইংরেজি সংবাদপত্র, শিশুতোষ গল্প বা সহজ ইংরেজি ম্যাগাজিন পড়ার অভ্যাস করতে হবে। পড়ার মধ্য দিয়েই মাথার ভেতর বাক্য গঠনের সঠিক কাঠামো তৈরি হয়।কোনো অনুচ্ছেদের মূলভাব বাংলায় আত্মস্থ করে তা নিজের মতো করে ইংরেজিতে রূপান্তর করার অভ্যাস করতে হবে। অন্ধ অনুকরণ নয়, নিজস্ব চিন্তার প্রতিফলনই লেখার আসল সৌন্দর্য।
শিক্ষাব্যবস্থার সাথে জড়িত নীতিনির্ধারক ও শিক্ষকদের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে বেশি। কোচিং সেন্টার বা নোটবইয়ের পৃষ্ঠা মুখস্থ করানোর যে বাণিজ্য চলছে, তার লাগাম টেনে ধরতে হবে। ক্লাসরুমগুলোতে মুখস্থ করানোর পরিবর্তে লেখার ও ভাব বিনিময়ের চর্চাকে উৎসাহিত করতে হবে।
যে দুই লাখের বেশি ছাত্র - ছাত্রী ইংরেজিতে হোঁচট খেয়েছে, তারা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই ভবিষ্যৎ। তাদের এই অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে হলে মুখস্থ বিদ্যার ভূত মাথা থেকে চিরতরে নামিয়ে ফেলতে হবে। মনে রাখতে হবে—মুখস্থ করা বিদ্যা সাময়িক পার পাইয়ে দিতে পারে, কিন্তু মেধার আসল বিকাশ ঘটায় স্বাধীন চিন্তা ও ফ্রিহ্যান্ড রাইটিংয়ের চর্চা।
সর্বোপরি সরকারকে এখন থেকেই সতর্ক ও সাবধান হয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে আনন্দ চিত্তে ইংরেজি শিখে এবং দেশে এমন অকৃতকার্যতার উদাহরণ তৈরি না হয়।
মো. মোরশেদ আলম
শিক্ষক ও সাংবাদিক