মোঃ আকাশ মিয়াজী
দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিম্ন আয়ের মানুষের আর্থিক চাপ কমানো এবং দারিদ্র্য মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
এর আগে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও ব্যাংক অব আমেরিকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে।
ড. তিতুমীর বলেন, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাবে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়তে পারে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ যতটা সম্ভব সীমিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি দরিদ্র মানুষের সহায়তা এবং নতুন করে দারিদ্র্যে পতিত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবায়নে অতীতে উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নানা ত্রুটি ছিল বলে উল্লেখ করেন ড. তিতুমীর। তাঁর ভাষ্য, প্রকৃত সহায়তাপ্রাপ্য অনেক মানুষ তালিকার বাইরে থেকে গেছেন, আবার অযোগ্য ব্যক্তিরাও তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
এ ধরনের সমস্যা কমাতে সরকার ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করে তাঁদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
ড. তিতুমীর বলেন, স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দারিদ্র্যের হার প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। তিনি আরও জানান, নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো সরকারের পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তাঁর মতে, রাজস্ব ও আর্থিক খাতের সংস্কারও জরুরি। সরকারের লক্ষ্য রাজস্ব আয় বাড়ানো, কর ফাঁকি ও জালিয়াতি বন্ধ করা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধির তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, গত অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে তা বেড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আইএমএফের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রসঙ্গে ড. তিতুমীর বলেন, পূর্বাভাস বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শর্ত ও পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হলে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, সেটিও পূর্বাভাসের ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, সংস্কারের মাধ্যমে তা দূর করতে চায় সরকার।
ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারকেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেন ড. তিতুমীর। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতের অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের কারণে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সামনে এসেছে।
তিনি জানান, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন। একই সঙ্গে অনেকে নতুন করে অর্থ জমা রাখছেন, যা আস্থা ফেরার ইঙ্গিত বলে উল্লেখ করেন তিনি। ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমে আসাকেও আর্থিক খাতের পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন উপদেষ্টা।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সারের আমদানি ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ বিষয়ে ড. তিতুমীর বলেন, সংকটের ফলে অর্থনীতির ওপর প্রকৃত প্রভাব বুঝতে বাড়তি আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি কৃষকদের ওপর সম্ভাব্য চাপও বিবেচনায় নিতে হবে। কৃষকদের ব্যয় কমাতে ডিজেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সংকট সৃষ্টিতে বাংলাদেশের ভূমিকা না থাকলেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এর অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন ও রপ্তানি সম্প্রসারণে বাংলাদেশকে উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র ও রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে জানান ড. তিতুমীর।
সরকারের লক্ষ্য নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়জনিত চাপ কমিয়ে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করা।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আইএমএফের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সভায় বৈশ্বিক অর্থনীতি, উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই আয়োজনকে।