নিজস্ব প্রতিনিধি
আল্লাহর সঙ্গে বা আল্লাহর ইবাদতে শরিক বা অংশীদার স্থাপন করা হারাম। আল্লাহর সঙ্গে এ শিরক বিভিন্ন প্রকারে হতে পারে। প্রথমেই সবচেয়ে বড় শিরক যেটা, সেটা হলো
আল্লাহ তাআলাকে ইবাদতের উপযুক্ত মনে না করে তার সঙ্গে শিরক করা। আল্লাহ বলেন,
وَلاَ تَجْعَلْ مَعَ اللهِ إِلَهًا آخَرَ فَتُلْقَى فِيْ جَهَنَّمَ مَلُوْمًا مَدْحُوْرًا আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্য স্থির কর না। তাহলে নিন্দিত ও (আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে) বিতাড়িত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। (সুরা বনি ইসরাঈল ৩৯)
আল্লাহর সঙ্গে শিরিক করলে অসহায় হয়ে পড়ার কথাও আল্লাহ তাআলা বলেছেন। আল্লাহ বলেন,
لاَ تَجْعَلْ مَعَ اللهِ إِلَهًا آخَرَ فَتَقْعُدَ مَذْمُوْمًا مَخْذُوْلاً আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্য স্থির করো না। তাহলে তুমি নিন্দিত ও অসহায় হয়ে পড়বে। (সুরা বনি ইসরাঈল ২২)
গায়রুল্লাহর নামে মানত করলে ঐ মানত পূর্ণ করা যাবে না। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন-
مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيْعَ اللهَ فَلْيُطِعْهُ وَمَنْ نَذَرَ أَنْ يَعْصِىَ اللهَ فَلاَ يَعْصِهِ যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের কাজে মানত করে, সে যেন তা পূরা করার মাধ্যমে তার আনুগত্য করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানিমূলক কাজে মানত করে, সে যেন তার নাফরমানি না করে। (অর্থাৎ মানত পূরা না করে)। (বুখারি ৬৬৯৬)
মহান আল্লাহ বলেন- حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيْرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهِ তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃতপ্রাণী, রক্ত, শূকরের গোশত, যেসব জন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়’। একটু পরেই বলেন, وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَنْ تَسْتَقْسِمُوْا بِالْأَزْلَامِ ذَلِكُمْ فِسْقٌ ‘যে জন্তু যজ্ঞবেদীতে যবেহ করা হয় এবং যা ভাগ্য নির্ধারক শর দ্বারা বণ্টন করা হয় (তাও হারাম)। এসব পাপ কাজ।(সুরা মায়েদা : আয়াত ৩)
এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
لَعَنَ اللهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَهُ وَلَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ وَلَعَنَ اللهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا وَلَعَنَ اللهُ مَنْ غَيَّرَ مَنَارَ الأَرْضِ যে ব্যক্তি নিজ পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয় তার উপর আল্লাহর লানত, যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু-প্রাণী জবাই করে তার উপর আল্লাহর লানত, যে ব্যক্তি কোন বিদআতীকে আশ্রয় দেয় তার উপর আল্লাহর লানত, যে ব্যক্তি জমির সীমানা পরিবর্তন করে, তার উপর আল্লাহর লানত। (মুসলিম ১৯৭৮, মিশকাত ৪০৭০)
إِنَّ اللهَ لاَ يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلاَلاً بَعِيْدًا নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শিরকের গুনাহ ক্ষমা করবেন না। তবে অন্যান্য গুনাহ ক্ষমা করতে পারেন। আর যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়। (সুরা নিসা : আয়াত ১১৬)
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِيْنَ مِنْ أَنْصَارٍ নিশ্চয়ই যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক স্থাপন করে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার আবাসস্থল হয় জাহান্নাম। আর জালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই। (সুরা মায়েদা : আয়াত ৭২)
তিনি আরও বলেন- وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللهِ إِلَهًا آخَرَ لاَ بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِنْدَ رَبِّهِ إِنَّهُ لاَ يُفْلِحُ الْكَافِرُوْنَ যে কেউ আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্যকে ডাকে, যার কোন সনদ তার কাছে নেই, তার হিসাব তার পালনকর্তার কাছে রয়েছে। নিশ্চয়ই কাফিররা সফলকাম হবে না। (সুরা মুমিনুন : আয়াত ১১৭)
আল্লাহ তাআলা নবীদেরকেও এ ব্যপারে সতর্ক করে দিয়েছেন এভাবে- فَلاَ تَدْعُ مَعَ اللهِ إِلَهًا آخَرَ فَتَكُوْنَ مِنَ الْمُعَذَّبِيْن (হে নবি!) আপনি আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকবেন না। তাহলে আপনি শাস্তিতে নিপতিত হবেন। (সুরা শুআরা : আয়াত ২১৩)
শিরকে আকবার তথা বড় শিরক মৃতব্যক্তির কাছে কিছু চাওয়া বা অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য দোয়া করা। কোনো মুমিন যদি এ কাজ করে তবে তার ঈমান বিনষ্ট হয়ে যাবে। কারণ ভাল-মন্দ দেয়া, না দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি বলেন-
قُلْ أَتَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللهِ مَا لاَ يَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلاَ نَفْعًا وَاللهُ هُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ (হে নবি!) আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন বস্তুর ইবাদত কর, যে তোমাদের অপকার ও উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। অথচ আল্লাহ সব শুনেন ও জানেন। (সুরা মায়েদা : আয়াত ৭৬)
আল্লাহর নবি হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই নিজের উপকার-অপকার করতে পারতেন না বলে কুরআনে প্রমাণ মিলে। সেখানে অন্যদের মাধ্যমে কি করে উপকার আশা করা যায়? আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ لاَ أَمْلِكُ لِنَفْسِيْ نَفْعًا وَلاَ ضَرًّا إِلاَّ مَا شَاءَ اللهُ (হে নবি!) আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধনের এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই কিন্তু আল্লাহ যা চান। (সুরা আরাফ : আয়াত ১৮৮)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-قُلْ أَفَاتَّخَذْتُمْ مِنْ دُوْنِهِ أَوْلِيَاءَ لاَ يَمْلِكُوْنَ لِأَنْفُسِهِمْ نَفْعًا وَلاَ ضَرًّا (হে নবি!) আপনি বলুন, তবে কি তোমরা আল্লাহ ছাড়া এমন অভিভাবক স্থির করেছ, যারা ভাল ও মন্দের মালিকও নয়। (সুরা রাদ : আয়াত ১৬)
মৃতব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া বা কাউকে গাওছুল আজম (সর্বোচ্চ সহযোগিতাকারী) মনে করাও বড় গুনাহের অন্তর্ভুক্ত; যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। মহান আল্লাহ বলেন-
إِنَّمَا تَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللهِ أَوْثَاناً وَتَخْلُقُوْنَ إِفْكاً إِنَّ الَّذِيْنَ تَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللهِ لاَ يَمْلِكُوْنَ لَكُمْ رِزْقاً فَابْتَغُوْا عِنْدَ اللهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوْهُ وَاشْكُرُوْا لَهُ إِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ- তোমরা তো আল্লাহর পরিবর্তে কেবল প্রতিমারই পূজা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করছ, তারা তোমাদের রিজিকের মালিক নয়। কাজেই আল্লাহর কাছে রিযিক তালাশ কর, তাঁর ইবাদত কর এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’ (সুরা আনকাবুত : আয়াত ১৭)
আল্লাহ পাক আরও বলেন-وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُوْ مِنْ دُوْنِ اللهِ مَنْ لاَّ يَسْتَجِيْبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُوْنَ যে ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে এমন বস্তুর পূঁজা করে, যে কেয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? তারাতো তাদের পূঁজা সম্পর্কেও বেখবর। (সুরা আহকাফ : আয়াত ৫)
কোন কিছু চাইতে হলে শুধু আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللهَ وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللهِ যখন তুমি কোন কিছু চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে তখন আল্লাহর কাছেই করবে। (তিরমিজি ২৫১৬; জামে ৭৯৫৭)
হজরত ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- مَنْ مَاتَ وَهْوَ يَدْعُو مِنْ دُوْنِ اللهِ نِدًّا دَخَلَ النَّارَ যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (বুখারি ৪৪৯৭)