চুনারুঘাট প্রতিনিধি
জাতীয় মহিলা সংস্থায় (জামস) ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি এবার গ্রেড কেলেংকারির তথ্য মিলেছে। এতে করে কতিপয় ব্যক্তি লাভবান হলেও প্রতি মাসে রাষ্ট্রীয় অর্থ গচ্চা হচ্ছে। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে তোয়াক্কা করছেন না সংশ্লিষ্টরা। বরং আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে বিষয়টি জায়েজ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।
সংস্থার জেলা কো-অর্ডিনেটরগণকে ১৬তম গ্রেড থেকে অবৈধভাবে জেলা কর্মকর্তার ১০ম গ্রেড পদে পদোন্নতি দেয়ার মাধ্যমে এ অনিয়মের সূত্রপাত। জানা গেছে, মহিলা ও শিশু বিষয়ক বিষয়ক মন্ত্রণালয়াধীন জাতীয় মহিলা সংস্থার অনুমোদিত অর্গানোগ্রামে কো-অর্ডিনিটের পদ ছিল না। এমনকি ২০১১ সালে সংশোধিত ‘জাতীয় মহিলা সংস্থার চাকুরী বিধিমালা ১৯৯৬’-তে ও কো-অর্ডিনেটরদের পদ রাখা হয়নি। অথচ বিএনপি শাসনামলে তৎকালীন মন্ত্রীর ইচ্ছায় অবৈধভাবে এসব নিয়োগ দেয়া হয়। ২০০৭ সালে জেলা কো-অর্ডিনেটরদেরকে সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে জেলা কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল। তবে এক বছর না পেরুতেই চলতি দায়িত্বের আদেশটি বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে নিয়োগকৃতদের চাকরি নিয়মিতকরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি হয়। এ প্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০১২ সালের শুরুর দিকে জামস’র ১৫ জন জেলা নির্বাহী অফিসার এবং ৩৫জন জেলা কো-অর্ডিনেটরের পদ রাজস্ব খাতে সৃজিত সাংগঠনিক কাঠামোতে সমপর্যায়ের পদে সমন্বয়ের বিষয়ে পত্র প্রেরণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় জামস’র সাবেক নির্বাহী পরিচালক নাজনীন বেগম ২০১৩ সালের ২৫ মার্চ মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত এক পত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক জেলা নির্বাহী অফিসারগণকে সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে এবং কো-অর্ডিনেটরদেরকে অফিস সহকারী পদে বদলী বা সমন্বয় করার প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তাছাড়া কো-অর্ডিনেটরদের নিয়োগপত্রের ৩ নং শর্তেও স্পষ্টভাবে উল্লখ রয়েছে যে, “আপনাকে জাতীয় মহিলা সংস্থার কোন জেলা বা থানা শাখায় সমবেতনে বদলী করা যাবে এবং সেক্ষেত্রে পদবী পরিবর্তন করা যাবে”।
তবে পদবী পরিবর্তনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে ৩১ জন কো-অর্ডিনেটর ২০১৩ সালে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (নং-১৪৫৬/২০১৩) দাখিল করেন। দীর্ঘ শুনানির পর ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল এ রিটের রায় প্রদান করা হয়। রায়ে ২০০৭ সালের ৪ এপ্রিল তারিখের পত্র অনুযায়ী সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে নিজ নিজ আহরিত বেতন স্কেল অনুযায়ী জেলা কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান করার কথা বলা হয়েছে। সংক্ষুব্ধরা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিলেও উক্ত রায় বহাল রাখা হয়।
সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরও সেটি বাস্তবায়নে নানা টালবাহানা শুরু হয়। অভিযোগ মতে, সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে মোটা অংকের নজরানা পেয়ে জাতীয় মহিলা সংস্থার শক্তিশালী সিন্ডিকেট অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছেন। তাদের পরামর্শেই বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখতে নানা অপকৌশল নেয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে কো-অর্ডিনেটরদের ব্যাপারে মতামত চেয়ে প্রশাসনিক মন্ত্রাণালয়ে পত্র প্রেরণ করে জামস। প্রশাসনিক মন্ত্রাণালয় ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক পত্রে ৩১ জন জেলা কো-অর্ডিনেটরদেরকে জাতীয় মহিলা সংস্থার অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত জেলা কর্মকর্তার শূন্য পদে মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ প্রদানের তারিখ (২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল) থেকে তাদের চাকুরী নিয়মিত করার জন্য মতামত প্রদান করেন।
কিন্তু জামস’র শক্তিশালী সিন্ডিকেট হাইকোর্টের রায় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত উপেক্ষা করে ২০১৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তারিখে স্মারক নং-জামস/প্রশা/নিকো-সাকম/১(২১২)/১২/৩৫৮ বলে তাদের চাকুরি জেলা কর্মকর্তা পদে নিয়মিত এবং পূর্বের চাকুরীর ধারাবাহিকতাসহ আর্থিক সুবিধা প্রদানপূর্বক গ্রেড পরিবর্তন করে আদেশ জারি করেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ৩ জুলাই জামস’র নির্বাহী কমিটির সভায় ৩১ জন জেলা কো-অর্ডিনেটরদেরকে হাইকোর্টের রায়কে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ভুতাপেক্ষাভাবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এটি সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূত বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
তাদের মতে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২০০৩ সালের ৩ মে জারিকৃত (স্মারক নং-মপবি/কঃবিঃশাঃ/কপগ-১১/২০০১-১১) সার্কুলার অনুযায়ী প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় কোন পদের পদনাম ও বেতন স্কেল পরিবর্তন করতে পারবে না। পদনাম ও বেতনস্কেল পরিবর্তন করতে হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের সম্মতি গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ জামস সংশ্লিষ্টরা সেটিরও তোয়াক্কা করেনি। বরং মন্ত্রণালয়কে ভুল বুঝিয়ে নিজেদের অনিয়মকে জায়েজ করার অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
সূত্র মতে, ২০২১ সালের ১৯ জানুয়ারি জাতীয় মহিলা সংস্থার ১ম ও ২য় শ্রেণীর পদে টাইমস্কেল /সিলেকশন গ্রেড প্রদান বিষয়ক সংশ্লিষ্ট কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সাবেক সভাপতি ও নির্বাহী পরিচালক মাকসুরা নূর এনডিসি (অতিরিক্ত সচিব) স্বাক্ষরিত সভার কার্যবিবরণীতে গৃহীত সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, “উপরোক্ত বিষয়ে সভার বিস্তারিত আলোচনা শেষে জেলা কর্মকর্তাদের আবেদন অনুযায়ী জেলা কর্মকর্তা পদে ভূতাপেক্ষভাবে পদায়নের তারিখ অর্থাৎ ০৪/০৪/২০০৭ তারিখ হতে সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেলের সুবিধা পাবেন কিনা সে বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রাণালয়ের মতামত গ্রহণের সুপারিশ করা হয়”। তবে উক্ত সভার সুপারিশের আলোকে অদ্যাবধি মন্ত্রণালয়ে কোন পত্র প্রেরণ করা হয়নি বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। উপরন্তু উক্ত বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত রয়েছে মর্মে ভুল বুঝিয়ে ২০২২ সালের ১০ আগস্ট তারিখের নির্বাহী কমিটির সভায় উক্ত ৩১ জনের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত ২৫ জন জেলা কর্মকর্তার টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড মঞ্জুর করা হয়। এতে করে বিধিবহির্ভূত ভাবে বকেয়াসহ বেতন ভাতা বাবদ বিপুল অংকের রাষ্ট্রীয় অর্থ গচ্চার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্ত করলে অনিয়মের আরো ভয়াবহ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলেও সূত্র দাবি করেছে।