মাহাবুবুর রহমান শিপন
নোয়াখালীর চাটখিলে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন চাটখিল-খিলপাড়া সড়ক নির্মাণের দুই মাসের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়কের পিচ উঠে গেছে, আবার কয়েকটি স্থানে সড়কের অংশ ধসে পড়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এ সড়কে চলাচলকারী হাজার হাজার মানুষ ও যানবাহনের চালকরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক যুগ ধরে চলাচলের অনুপযোগী এ সড়কটি নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছিল। তবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কের এমন বেহাল দশায় ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) অধীনে চাটখিল-খিলপাড়া সড়কের প্রায় ৭ কিলোমিটার অংশ নির্মাণের জন্য ৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজটি পান ঠিকাদার মোরশেদ আলম। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যাদেশ ও নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজ না করায় নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কের বিভিন্ন অংশে ছোট-বড় গর্ত ও ফাটল দেখা দিয়েছে। অনেক স্থানে নিম্নমানের বিটুমিনযুক্ত পাথর হাত দিয়েই উঠে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে এবং কোথাও কোথাও পিচ উঠে গিয়ে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ভেঙে যাওয়া অংশে পুনরায় বালি ও পাথর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সড়কের পাশের ধসে পড়া অংশগুলো বালুর বস্তা ও কালো পলিথিন দিয়ে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১০ থেকে ১৫টি স্থানে সড়কের অংশ ধসে পড়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কার্যাদেশ অনুযায়ী বিটুমিন-পাথরের ৪০ মিলিমিটার পুরুত্বের ঢালাই দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক স্থানে ২৫ থেকে ৩০ মিলিমিটার পুরুত্বে ঢালাই দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আগে সড়কের কাজ এবং পরে গাইড ওয়াল নির্মাণ করায় কয়েকটি স্থানে সড়ক ধসে পড়েছে বলে তারা দাবি করেন। গাইড ওয়াল নির্মাণের পর সঠিকভাবে মাটি ভরাট না করায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কাজ শেষ হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই পাথরের ওপরের কালো বিটুমিনের আবরণ উঠে গিয়ে সড়কের অনেক অংশ ধূসর হয়ে গেছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, নির্মাণকাজে নিম্নমানের ও পরিমাণে কম বিটুমিন ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি সুগার মিলের গাদ ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন তারা।
সড়কে চলাচলকারী ছয়ানী টবগা গ্রামের কফিল উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, “ঠিকাদার প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূর থেকে বিটুমিন-পাথর মিক্স করে এনে এখানে কাজ করেছেন। অত্যন্ত নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের কারণে কাজ শেষ হওয়ার পরপরই সড়কের অধিকাংশ জায়গা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। আমরা এই সড়কের পুনর্নির্মাণ চাই এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের শাস্তি দাবি করছি।”
সিএনজি চালক হান্নান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই ভাঙা রাস্তা নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন অনেক কষ্ট করেছি। আশা ছিল নতুন রাস্তা হলে সেই কষ্ট লাঘব হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, কাজ শেষ হওয়ার আগেই রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ করা হয়েছে।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সড়ক নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যেই যদি এমন বেহাল হয়ে পড়ে, তাহলে নির্মাণকাজের মান, তদারকি এবং প্রকল্প ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে তদন্ত হওয়া জরুরি। অন্যথায় সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি জনদুর্ভোগও অব্যাহত থাকবে।
এ বিষয়ে ঠিকাদার মোরশেদ আলম বলেন, “রাস্তাটির কাজ এখনো আমরা সমাপ্ত করিনি। যেসব স্থানে সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেসব স্থানে আমরা অবশ্যই সঠিকভাবে কাজ করে দেব।”
সড়ক ও জনপথ বিভাগের চাটখিল অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আমির হোসেন বলেন, “রাস্তায় যে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের নজরে আছে। বৃষ্টিপাত একটু কমলেই এসব সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সফিকুল ইসলামও সড়কের দুরবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, “সিডিউল অনুযায়ী দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি শেষ করবে।”