নিজস্ব প্রতিনিধি
বিএনপির দুঃসময়ে রাজনীতি করতে গিয়ে ক্রসফায়ারে পা হারানো ছাত্রদলের সাবেক সহ-সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সাইফ এখন চট্টগ্রাম নগরীর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত এক নাম। দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক জীবনে মামলা, হামলা, কারাবরণ ও শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হলেও রাজপথ থেকে সরে যাননি তিনি। এক পায়ে ভর করেই এখনও অংশ নিচ্ছেন দলীয় কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ ও মিছিল-মিটিংয়ে।
তৎকালীন সরকারের সময়ে বিএনপির রাজনীতি করা যখন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তখনও চট্টগ্রাম নগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডে নিয়মিত মিছিল-মিটিংয়ে সক্রিয় ছিলেন সাইফুল ইসলাম সাইফ। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে দমাতে একের পর এক মামলা, হামলা ও হয়রানির শিকার করা হয়। একপর্যায়ে তাঁকে ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘চাঁদাবাজ’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ তাঁর অনুসারীদের।
সাইফের দাবি, ২০২১ সালের ১৬ জুন রাতে নগরীর অক্সিজেন মোড় থেকে তৎকালীন বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি কামরুজ্জামানসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁকে তুলে নিয়ে যান। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, চোখ বেঁধে তাঁকে লিংক রোড এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে উপুড় করে ফেলে তাঁর বাম পায়ে দুটি গুলি করা হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসা নিতে গিয়ে চিরতরে বাম পা হারান তিনি। সেই ঘটনার পর থেকেই এক পায়ে ভর করে চলতে হচ্ছে তাঁকে।
পা হারানো, দারিদ্র্য, অসংখ্য মামলা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি সাইফ। হাসপাতালের চিকিৎসা থেকে শুরু করে পরিবারের নানা সংকট সবকিছুর মধ্যেই তিনি বিএনপির কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি সময় শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে পার করেও দলীয় আদর্শ থেকে সরে যাননি বলে জানান তাঁর ঘনিষ্ঠরা।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিভিন্ন সভা, মিছিল ও গণসংযোগে সাইফের উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাঁর কর্মসূচিগুলোতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ছে। এ নিয়ে সাইফের অনুসারীদের দাবি, দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও সক্রিয়তার কারণে তৃণমূল পর্যায়ে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।
তবে সাইফের অনুসারীদের অভিযোগ, তৎকালীন সরকারের সময়ে দেওয়া ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘চাঁদাবাজ’ তকমা এখনও তাঁকে অনুসরণ করছে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পরও একটি মহলের কাছে সাইফের অতীতের পরিচয় ও বর্তমান জনপ্রিয়তা নিয়ে বিরূপ মনোভাব রয়েছে।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের ত্যাগ ও বঞ্চনার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত সাইফুল ইসলাম সাইফ বলেন, “আওয়ামী লীগের দেওয়া তকমা যখন এখনো শুনি, চোখ থেকে নীরবে অশ্রু আসে। যে রাতে পা হারিয়েছি, সেখান থেকে ফিরে আসার কথা ছিল না। জাতীয়তাবাদী আদর্শ বুকে ধারণ করে বেঁচে আছি এবং জীবন দিয়ে যাব। কিন্তু কষ্ট হয় যখন ভাবি, হয়তো জীবিত অবস্থায় এই ত্যাগের কোনো মূল্য পাব না। মারা যাওয়ার পর হয়তো মিডিয়ায় লাল অক্ষরে শিরোনাম হবে আর দল আফসোস করবে।”
সাইফের ভাষায়, তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা মৃত্যুর পর নয়, জীবিত থাকতেই যেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ, নির্যাতন ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়। পঙ্গুত্বকে জয় করে এখনও রাজপথে সক্রিয় থাকা সাইফের রাজনৈতিক পথচলা তাই চট্টগ্রামের তৃণমূলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।