মোরশেদ আলম, বিশেষ প্রতিনিধি
ভারতজুড়ে মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার এবং ঈদগাহ লক্ষ্য করে উচ্ছেদের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে এই ধরনের ঘটনা বেশি দেখা গেছে, যেখানে কর্তৃপক্ষ প্রায়শই এসব পদক্ষেপকে অবৈধ দখল, রাস্তা প্রশস্তকরণ বা পুনউন্নয়ন অভিযান হিসেবে যুক্তি দেখিয়ে থাকে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ গুজরাটের বেট দ্বারকায় মসজিদ, মাজার এবং একটি কবরস্থানসহ ৩৬টি কাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়। অবৈধ দখলসংক্রান্ত আদালতের রায়ের পরই এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। অন্যদিকে মুসলিম প্রতিনিধিরা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ওই এলাকা থেকে মুসলিম সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মুছে ফেলার অভিযোগ তোলেন।
আসামে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে কর্তৃপক্ষ ২১টি মসজিদ, ৪৪টি মাদ্রাসা এবং ৯টি ঈদগাহ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং হাজার হাজার মুসলিম পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করেছে। গোয়ালপাড়া, ধুবরি এবং নলবাড়ীতে উচ্ছেদ অভিযান মূল্যায়নের সময় জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান উঠে আসে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে, গুজরাট হাইকোর্ট আহমেদাবাদের ৪০০ বছরের পুরনো মানচা মসজিদের আংশিক ভাঙার ওপর স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করে। অথচ মসজিদ কমিটি এটিকে একটি নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তি এবং এর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় তাৎপর্যের কথা আদালতকে জানিয়েছিল।
সবচেয়ে ব্যাপক উচ্ছেদের তরঙ্গ নথিবদ্ধ হয় ২০২৬ সালের মে এবং জুন মাসে। এ সময় দিল্লি, মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান এবং হরিয়ানায় মাত্র ৪৪-৪৫ দিনের মধ্যে অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় কাঠামো—মসজিদ, মাদ্রাসা, দরগাহ এবং ঈদগাহসহ—ভেঙে ফেলা হয়। এর মধ্যে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক মসজিদ ও মাজারও ছিল।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসেও এই ধারা অব্যাহত থাকে। ৫ সেপ্টেম্বর উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে জেলা আদালত উচ্ছেদ বহাল রাখার রায় দেওয়ার কয়েকদিন পরেই কালেক্টরেট চত্বরের ভেতরে থাকা এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো একটি মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। ব্যাপক পুলিশ মোতায়েনের মধ্যে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, যেখানে বিরোধী দলের নেতা ও মুসলিম সংগঠনগুলো এই পদক্ষেপের ত্বরিত কার্যকারিতা এবং আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এর কিছুদিন পরেই উত্তর প্রদেশে আরেকটি মসজিদ উচ্ছেদের হুমকির মুখে পড়ে। মোরাদাবাদ ডেভেলপমেন্ট অথরিটি পকবাড়া এলাকার মুস্তফা মসজিদকে অননুমোদিত ঘোষণা করে এবং মসজিদ কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাড়া না দিলে তা ভেঙে ফেলার হুঁশিয়ারি দিয়ে নোটিশ জারি করে। সাহারানপুরে উচ্ছেদ অভিযানের ঠিক পরেই এই নোটিশ দেওয়ায়, অননুমোদিত নির্মাণ ও দখলের অজুহাতে সচল মসজিদগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ নিয়ে মুসলিম ও অধিকারকর্মীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে ভারতীয় মুসলিম সমাজ নীরব থাকতে পারে না। মসজিদ, মাদ্রাসা, ঈদগাহ এবং মাজারগুলো কেবল সাধারণ কোনো ভৌত কাঠামো নয়, বরং এগুলো সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, শিক্ষাগত এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নির্বিচার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ও আইনানুগ উপায়ে ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর তুলতে হবে ভারতীয় মুসলিম, রাজনৈতিক প্রতিনিধি, ধর্মীয় স্কলার, সুশীল সমাজের সংগঠন এবং মানবাধিকার রক্ষাকারীদের। একইসঙ্গে আইনের সমান প্রয়োগ ও যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি জানাতে হবে এবং মুসলিম ধর্মীয় সম্পত্তির জন্য বিচারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা চাইতে হবে। একটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের বিরুদ্ধে নীরবতা অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণকে আরও উৎসাহিত করতে পারে; তাই ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষায় ধারাবাহিক, সংগঠিত এবং সাংবিধানিক বিরোধিতাই একমাত্র পথ।
(CN থেকে গৃহীত সংবাদ অবলম্বনে)