মাহাবুবুর রহমান শিপন, স্টাফ রিপোর্টার
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত কয়েক মাসে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার পুনর্গঠন। মব সহিংসতা, মাদক, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাধিক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে।
সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ কমেছে এবং পুলিশের অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বেড়েছে। তবে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তার, কারাগারে চাপ, মব সহিংসতা, পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব—এসব বিষয় এখনো আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
অপরাধের পরিসংখ্যানে কী পরিবর্তন?
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-আগস্টের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে মব সহিংসতা ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মব সহিংসতার ঘটনা ৮৯টি থেকে কমে ৫৬টিতে এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ৯৯৯টি থেকে কমে ১৬৩টিতে নেমেছে।
তবে অপরাধের পরিসংখ্যান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু মামলা বা ঘটনার সংখ্যা কমেছে কি না, সেটিই একমাত্র সূচক নয়। মামলা গ্রহণের হার, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ করার সক্ষমতা, তদন্তের গুণগত মান, বিচার নিষ্পত্তির হার এবং অপরাধের প্রকৃত চিত্রও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ফলে পরিসংখ্যানের ইতিবাচক পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নে আরও বিস্তৃত তথ্য প্রয়োজন।
বিশেষ অভিযানে ব্যাপক গ্রেপ্তার
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত কয়েক মাসে দেশব্যাপী বড় আকারের বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের ২৭ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে অন্যান্য মামলা ও অভিযানে আরও ১ লাখ ৪১ হাজার ৬২৮ জন গ্রেপ্তার হওয়ায় মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৪৬ জনে।
অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের তথ্যও দিয়েছে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ৪৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪ হাজার ৭২২ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ১৬৫টি ম্যাগাজিন, ৬৫টি ককটেল, ২.২৫ কেজির বেশি গানপাউডার এবং ৮৯৩টি দেশীয় অস্ত্র। এছাড়া অস্ত্র ও বোমা তৈরির সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযানে বড় উদ্ধার
বিশেষ অভিযানে মাদকবিরোধী তৎপরতাও ছিল উল্লেখযোগ্য। পুলিশের প্রকাশিত হিসাবে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি ইয়াবা, ১০ হাজার ৭৩২ প্যাকেট হেরোইন, ৩০ হাজার ৪২৭ বোতল ফেনসিডিল, ১৩ হাজার ৮৬৫ বোতল বিদেশি মদ, ৫৬০ বোতল দেশীয় মদ এবং ১২ হাজার ৫৩টি প্যাকেট গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে।
মাদক উদ্ধারের ঘটনায় ২৩ হাজার ২২১টি মামলা করা হয়েছে এবং ৩৪ হাজার ৪৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শুধু মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক, চোরাচালান চক্রের অর্থের উৎস এবং এর পেছনের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াকেও বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের ওপরও বাড়ছে চাপ
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনাও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনবিক্ষোভ ও অপরাধ দমনের সময় পুলিশের পেশাদার আচরণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগের ক্ষমতার পাশাপাশি সেই ক্ষমতার ওপর কার্যকর নজরদারি, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ে নতুন সম্ভাবনা
আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআইভিত্তিক ক্যামেরা, সিসিটিভি মনিটরিং, বডি-ওর্ন ক্যামেরা এবং ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার পুলিশের কার্যক্রমকে আরও তথ্যনির্ভর করার সুযোগ তৈরি করছে।
বিশেষ করে বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে পুলিশের কর্মকাণ্ডের ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ পাওয়া সহজ হতে পারে, অন্যদিকে কোনো সদস্যের অসদাচরণ শনাক্ত ও জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগও তৈরি হবে।
সাইবার অপরাধ ও গুজব নতুন চ্যালেঞ্জ
প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এখন বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। গুজব, ভুয়া তথ্য, ধর্মীয় উসকানি, মানহানিকর কনটেন্ট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার কখনো কখনো অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
ফলে সাইবার মনিটরিং, ডিজিটাল ফরেনসিকস, তথ্য যাচাই এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে গুজব ও অপরাধমূলক কনটেন্ট দমনের পাশাপাশি বৈধ মতপ্রকাশ ও সমালোচনার অধিকার রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অপরাধী ফেরানোর উদ্যোগ
দেশের বাইরে আত্মগোপনে থাকা আসামিদের আইনের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সহযোগিতা নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
বিদেশে অবস্থানরত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।
গ্রেপ্তার নয়, টেকসই বিচারই চূড়ান্ত সাফল্য
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি মূল্যায়নে গ্রেপ্তারের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই চূড়ান্ত সাফল্যের মাপকাঠি নয়। বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজারের বেশি গ্রেপ্তার এবং প্রায় দুই লাখ মোট গ্রেপ্তারের পর এখন বড় প্রশ্ন—এই বিপুলসংখ্যক মামলার তদন্ত কতটা কার্যকর হচ্ছে, কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে, কতজন আদালতে দণ্ডিত হচ্ছেন এবং কতজন শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হচ্ছেন?
একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থায় পুলিশি অভিযান, তদন্ত, প্রসিকিউশন ও আদালত—এই চারটি স্তরের সমন্বিত কার্যক্রম জরুরি। তাই ভবিষ্যতের সাফল্য শুধু ‘কতজন গ্রেপ্তার’ দিয়ে নয়; বরং কতটি মামলা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত হয়েছে, কতটি দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কতটা ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে—তা দিয়েও পরিমাপ করতে হবে।
জনআস্থা পুনর্গঠনই সবচেয়ে কঠিন কাজ
পুলিশের পেশাদারিত্ব পুনরুদ্ধার শুধু অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত, স্বচ্ছ নিয়োগ, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, মানবাধিকারভিত্তিক আইন প্রয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি।
জনগণ পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে ভয় পেলে, ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে আস্থা হারালে কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় আইন প্রয়োগে প্রভাব ফেললে কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তাই আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সংস্কারের পাশাপাশি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে বড় ছয় চ্যালেঞ্জ
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কিছু ইতিবাচক সূচক দেখা গেলেও সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—
প্রথমত, মব সহিংসতা ও গুজবের দ্রুত বিস্তার।
দ্বিতীয়ত, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ চক্র ভেঙে দেওয়া।
তৃতীয়ত, পুলিশ ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
চতুর্থত, বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তারের পর তদন্ত ও বিচারব্যবস্থার ওপর তৈরি হওয়া চাপ সামলানো।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক উত্তেজনার সময় আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা।
ষষ্ঠত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিকের গোপনীয়তা ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করা।
অভিযানের পর এখন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার পালা
গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের দাবি এবং বড় আকারের অভিযান পরিচালনার চিত্র স্পষ্ট। বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজার ৫১৮ জন গ্রেপ্তার এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের তথ্য পুলিশের অভিযানিক তৎপরতার ব্যাপ্তি তুলে ধরে।
তবে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য শুধু অপরাধের সংখ্যা কমানো কিংবা গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য প্রয়োজন আইনের শাসন, নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার, মানবাধিকার, প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা এবং জনগণের আস্থা।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা তাই এখন—অভিযান থেকে প্রতিষ্ঠান, গ্রেপ্তার থেকে বিচার এবং কঠোরতা থেকে টেকসই জনআস্থায় পৌঁছানো।